কল্পতরু (শিশুতোষ গল্প)

আপনার নিজের লেখা ছোটো গল্প পোস্ট করার বিভাগ
Post Reply
User avatar
tasnima
Posts: 23
Joined: Tue Mar 26, 2019 4:07 pm
Reputation: 2
Location: Bangladesh
Gender:
Bangladesh

Mon Apr 15, 2019 5:46 am

Image
তাসনিমা মনসুর
User avatar
tasnima
Posts: 23
Joined: Tue Mar 26, 2019 4:07 pm
Reputation: 2
Location: Bangladesh
Gender:
Bangladesh

Mon Apr 15, 2019 5:47 am

খুব কাছেই কোথাও একটা পেঁচা ডেকে ওঠায় ঘুম ভেঙে যায় রবির। চোখ কচলে উঠে বসে সে, ও মা! তার জানলাতেই বসা দেখি পেঁচাটা! কিন্তু এই পেঁচাটা তো অন্য সব পেঁচার মত নয়? এত্ত রংবেরঙের সমাহার তো পেঁচার হয় না! তার ওপর কোথায় যেন পেঁচাটাকে দেখেছে বলেও মনে হচ্ছে রবির। কোথায়? আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতেই পেঁচাটা ডেকে ওঠে আবার, যেন বলছে, "কী এত ভাবছো রবিবাবু? মনে পড়ছে না কোথায় দেখেছ আমায়?" নিজের অজান্তেই না-সূচক মাথা নাড়ে রবি। হঠাৎ চোখ যায় তার আঁকার খাতাটার দিকে, আর সাথে সাথে মনে পড়ে যায়!
আরে! এই পেঁচাটাকেই তো সে আজ আঁকলো তার মঙ্গল শোভাযাত্রার ছবিটায়! বছর ছয়েকের রবির স্কুলে যেতে মোটেও ভালো না লাগলেও ছবি আঁকতে ভী-ষ-ণ ভালো লাগে। আর পহেলা বৈশাখ তো এমনিতেই রঙের উৎসব। ছোট বলে ভোরে উঠে যেতে না পারলেও মঙ্গল শোভাযাত্রার ছবি ও অনেক দেখেছে। খুব ভালো লাগে রবির শোভাযাত্রাটা। বাঘ, বিড়াল, পেঁচা, কতরকমের যে মুখোশ আর কী তাদের রঙের বাহার! আর দুদিন, তারপরেই তো পহেলা বৈশাখ, তাই তো রবি আঁকলো এই ছবিটা। এ কী এ কী! খাতাটার ডানা গজালো কীভাবে! কোথায় উড়াল দিচ্ছে?! এই যা! জানলা পেরিয়ে চলে গেল? পেঁচাটাও মহা দুষ্টু তো! খাতাটাকে তো আটকালো না-ই, নিজেও উড়ে গেল!

হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে কিনা ভাবছে রবি। ইশ... কত্ত শখের খাতাটা.. কত কত ছবি ছিলো! এমন সময় ঘরটা হঠাৎ হালকা একটা আলোতে ভরে যায়। পড়ার টেবিলের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে একটা প্রজাপতি। নীলচে নীলচে ছোপ-আলা ডানা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে বিশাল প্রজাপতিটা যেন রবিকে পিঠে চেপে বসার আমন্ত্রণ জানায়। এই প্রজাপতিটাকেও না রবি এঁকেছে ছবিটায়? "উহহু রবি, বড্ড বেশি ভাবো তুমি! হ্যাঁ রে বাবা, আমি তোমার সেই নীল প্রজাপতিই। এবার জলদি জলদি এসো তো, দেখি ওরা কোথায় গেল", অস্থির ভঙ্গিতে শুঁড় নাড়িয়ে যেন বলে প্রজাপতি।
ভয়ে ভয়ে প্রজাপতির পিঠে চেপে বসে রবি, এর আগে কখনও ওঠেনি, ভয় তো পাবেই; ফেলে-টেলে দেয় যদি? তবে সেরকম কিছু ঘটে না। রবি ওঠার সাথে সাথে প্রজাপতি পাখাগুলো মেলে দেয় আর কী অবাক কান্ড! মাথার ওপরের ছাদটা উধাও হয়ে সেখানে জুড়ে বসে রাতের আকাশ। কিন্তু কই রাত বলে তো মনে হচ্ছে না মোটেও? বরং কেমন নরম একটা আলোয় ভরে আছে চারপাশটা। খুব ভালো লাগতে থাকে রবির। কখনও এমন গভীর রাতে বের হয়নি সে। রাতের পৃথিবী যে এত সুন্দর সে জানতই না!

প্রজাপতিটা রবিকে নিয়ে যেতে যেতে মাঝে মাঝেই ফুলে ফুলে বসছে, মধু খাচ্ছে। রবি কখনও দেখেনি এত কাছে থেকে প্রজাপতির মধু খাওয়া।দেখে যারপরনাই চমৎকৃত হয় রবি। শুধু তাই না, যেতে যেতে কত নাম-না-জানা ফুল আর গাছ সে দেখে! এবার প্রজাপতিটা একটু ওপরে ওঠে। নিচে তাকিয়ে রবি দেখে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে রাস্তায় বসে আছে। ‘কী করছে ওরা?’, রবি অবাক হয়। যেন তার মনের কথা বুঝতে পেরেই প্রজাপতিটা একটু কাছে যায় ওদের। এ তো পহেলা বৈশাখের আল্পনা! প্রত্যেকবার নববর্ষে বাবা-মা’র সাথে বেড়াতে বের হয়ে রবি এরকম আল্পনা দেখে আর ভাবে এগুলো কোথা থেকে আসলো রাস্তায়। এভাবেই তবে আল্পনাগুলো চলে আসে? ছেলেমেয়েরা আল্পনা আঁকতে আঁকতে মুখ তুলে রবিকে দেখে, আর হেসে হাত নাড়ে। রবিও হাত নেড়ে জবাব দেয়। কিছুদূর গিয়েই এরপর রবি দেখতে পায় হাতে সাদা সাদা কী যেন সাজিয়ে রাখছে কয়েকজন মিলে। ও মা! এ তো দেখি ছোট্ট ছোট্ট হাতি, ঘোড়া! ওই যে রবি মেলায় গিয়ে কেনে না প্রতিবার ছোট ছোট তালমিছরির হাতি, ঘোড়া? সেগুলোই তো এগুলো! রবির খুব ইচ্ছে করে হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিতে কয়েকটা। কিন্তু তারপরেই মনে হয় না, এগুলোও নিশ্চয়ই পহেলা বৈশাখের জন্যই। ‘থাক, মেলায় গিয়ে কিনব নাহয়’, ভেবে ওদেরকেও হাত নেড়ে দেয় রবি। ইশ এত্ত কিছু হয় নাকি রাতের বেলায়? ভাবতেই রোমাঞ্চ হচ্ছে রবির। উড়তে উড়তে একসময় একটা জটলার মধ্যে এসে থামে প্রজাপতি। যে-সে জটলা নয়, বনের পশুপাখি সবাই যেন এসে একখানে জড়ো হয়েছে আর কলরবে মুখর করে তুলছে রাতের পরিবেশকে। এ কী, সেই পেঁচাটাও আছে এখানে, গোল গোল চোখ মেলে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে যেন ঠিক! আর এই তো রবির খাতাটা! ওই যে সেই রংবেরঙের বাঘটা, রবি যাকে এঁকেছিল শোভাযাত্রার ছবিতে, আর ওই যে, ওই যে বিড়ালটা! ছবির সবাইই আছে তাহলে এখানে! ওরাই নয়, আরও আছে কচ্ছপ, সিংহ, শিং-আলা হরিণ, দোয়েল, ফিঙ্গে, এমনকি গাছের ডাল থেকে উল্টো হয়ে ঝুলছে বানরও! চারদিকে সাজ-সাজ রব, কেউ ফুলের মালা গাঁথছে, কেউ বা আবার রংতুলি নিয়ে আয়নার সামনে বসে গেছে। কিন্তু কী হয়েছে এখানে? এত সাজগোজ কেন? এক পা, দু পা আগাতেই রবিকে দেখে একসাথে কলরব করে ওঠে সবাই। আর কী আশ্চর্য, রবি ওদের সবার কথা বুঝতে পারছে! ‘উফফ প্রজাপতি তুমি বড় ঢিলে, এত দেরি করে এলে রবিকে নিয়ে?’, বলতে বলতে এগিয়ে আসে পেঁচা। প্রজাপতি বলে, ‘আর বলো না ভাই, রবি তো প্রথমে ভয়ই পেয়ে গেছিল আমার সাথে আসবে কিনা ভেবে!’ শুনে হেসে ওঠে সবাই। রবি এবার সাহস করে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের কী হয়েছে? এত সাজছ কেন?’ সিংহ বলে ওঠে, “সে কী রবি তুমি জানো না? পহেলা বৈশাখে আমাদের নিয়েই তো তোমরা মঙ্গল শোভাযাত্রা কর! তো আমাদের একটু সাজুগুজু না করলে কি চলে নাকি? কিন্তু এ তোমার বড় অন্যায় রবি, তুমি আমাকে একটুও আঁকোনি তোমার ছবিতে।” বলতে বলতেই বাঘমামা এগিয়ে আসে, “তুমিই এর ব্যবস্থা কর তো রবি! সেই কখন থেকে মন খারাপ করে বসে আছে ও কেন আমার মত রংবেরঙের না।”, শুনে হেসে ফেলে রবি। আর সিংহ বলে, “উহু হাসলে চলবে না, এই নাও রংতুলি, আমায় সাজিয়ে দাও দেখি এরকম ঝলমলে রঙিন করে।” বাকি সবাইও এগিয়ে আসে, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমার কানটা ঠিক ভালো লাগছে না, একটু সুন্দর করে রঙ করে দাও দেখি!”, “এহহে আমার ন্যাজটা কীরকম বিচ্ছিরি হয়ে আছে রবি, দাও না ভাই একটু ঠিক করে?”, “আমার নাকটা একদম বোঁচা দেখ! এরকম হলে লোকে আমার মুখোশ পড়বে নাকি? রবি, ছোট্ট সোনা। দাও না একটু এঁকে?” রবি বলে, “আচ্ছা বাবা দাঁড়াও দাঁড়াও, একজন একজন করে এসো, উঁহু একদম দুষ্টুমি চলবে না। কে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হবে এগিয়ে এসো আগে।”, বলতে না বলতেই বানরটা লাফ মেরে বসে রবির ঘাড়ে। তারপর চলতে থাকে রঙের খেলা, রবি একমনে এঁকে যেতে থাকে, কী ভালোই না লাগছে তার!

***************************************************************************************************************************************

-“রবি, এই রবি? কী বকছিস ঘুমের মধ্যে? এই ওঠ না! স্কুলে যাবি না?”, মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে যায় রবির। চোখ চলে যায় টেবিলের দিকে, খাতাটা ওখানেই আছে। এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল সে? বড্ড মন খারাপ হয়ে যায় রবির।
পহেলা বৈশাখ। আজ কোনরকম ডাকাডাকি ছাড়াই ঘুম ভেঙ্গে যায় রবির। মাত্র ভোর হয়েছে। বাইরে কাদের যেন শোরগোল শোনা যাচ্ছে। এক দৌড়ে জানলার কাছে চলে যায় সে। মঙ্গল শোভাযাত্রা যাচ্ছে। সেখানে বাঘ, সিংহ, বানর, পেঁচা, কচ্ছপ, বিড়াল, প্রজাপতি সবধরনের মুখোশ আছে, এমনকি বিশাল একটা প্রজাপতিও যাচ্ছে লাঠির আগায় চড়ে। ও মা, কী অবাক কান্ড! এ তো সেই নীল প্রজাপতিটা! ডানাটা নড়ে উঠলো না? কেউ দেখল না কেন? রবির জানলা পার হয়ে যাওয়ার সময় শুঁড় নাড়িয়ে নাড়িয়ে প্রজাপতিটা রবিকে বলে, “শুভ নববর্ষ রবি।” হঠাৎ করেই মন ভালো হয়ে যায় রবির। সেও হাত নেড়ে বলে, “শুভ নববর্ষ!”
তাসনিমা মনসুর
Post Reply