এ পরবাসে........

ঘুরে বেড়াতে কার না ভালো লাগে? আপনার ভ্রমণ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা আমাদের জানান।
Post Reply
musicmaniac1
Posts: 7
Joined: Tue Mar 26, 2019 4:22 pm
Reputation: 0
Location: New Jersy
Gender:
United States of America

এ পরবাসে........

Post by musicmaniac1 » Tue Mar 26, 2019 4:24 pm

মুখবন্ধ:

জীবনের ঘটনাসূত্রে আমেরিকাতে এসে পড়েছি - এখানে আসার ঠিক পরিকল্পনা ছিল না, প্রায় কোনো মানসিক প্রস্তুতি ও ছিল না। তাই এখানে এসে আমি নিজের মত করে এই দেশটার সাথে, এই দেশের মানুষ গুলোর সাথে পরিচিত হয়েছি, একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই দেশটাকে দেখবার বা বোঝবার চেষ্টা করেছি। সেই অনুভূতি গুলো সবার সাথে share করার জন্যই আমার এই প্রচেষ্টা । আমার ব্যক্তিগত জীবনের গতানুগতিক কথা বলার জন্য এই লেখা নয় - যদিও কিছু ব্যক্তিগত ঘটনা যেগুলো আমাকে প্রভাবিত করেছে সেগুলো হয়ত এসেই যাবে। এই লেখাতে আমি কারোর নাম বা ব্যক্তিগত পরিচিতি সম্পর্কিত কোনো নাম বা জায়গার নাম প্রকাশ করব না - তাই সংক্ষেপে কারোর নাম A বা B এই ভাবে লিখব - কারণ যাদের কথা লিখতে চাই - তারা কেউই আমাকে তাদের পরিচয় প্রকাশ করার অনুমতি দেন নি - আশা করি পাঠক বা পাঠিকা হিসাবে আমাকে ক্ষমা করবেন।

আরো একটা কথা - আমি লিখতে পারি না - লেখার একটা চেষ্টা করছি মাত্র। তাই ভুল ভ্রান্তি গুলো ধরিয়ে দিলে চেষ্টা করব যাতে লেখাটা এই ফোরাম এর যোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

ধন্যবাদ !

musicmaniac1
Posts: 7
Joined: Tue Mar 26, 2019 4:22 pm
Reputation: 0
Location: New Jersy
Gender:
United States of America

Re: এ পরবাসে........

Post by musicmaniac1 » Tue Mar 26, 2019 4:26 pm

দীর্ঘতম দিন:

প্লেন টা একটু নিচের দিকে নামতেই আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল - জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলাম নিচের অতলান্তিক মহাসাগরের জল দেখা যাচ্ছে আর তার পাশে উঁচু উঁচু সব আকাশ ছোয়া বাড়ি - পাশে বসা ঘুমন্ত কন্যা কে ডেকে বললাম - ‘ওঠ ওঠ আমরা এসে গেছি রে’! একটানা প্রায় ১৬ ঘন্টা প্লেনে বসে থাকার পরে আমার এবং আমার ৫ বছরের কন্যা অবস্থা খুবই খারাপ - ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি - যখনই ঘুম ভাঙ্গে, সূর্যের আলো যেন প্রখর থেকে প্রখরতর হয়ে ওঠে - সময়ের কাঁটা পিছিয়ে পড়তে থাকে - একটার পর একটা time zone অতিক্রম করতে থাকি - ফলে প্রায় ২২ ঘন্টা আগে যাত্রা শুরু করেও ক্যালেন্ডার অনুযায়ী একই দিনে সাত সমুদ্র তের নদীর পারে বিদেশ ভূমি তে এসে পৌঁছলাম। আমরা আসছি আমার husband - H এর কাছে - যে প্রায় বছর খানেক আগে কার্যসুত্রে আমেরিকাতে চলে এসেছে।

প্লেন এ যা খাবার দিয়েছিল, তার বেশির ভাগই খেতে পারি নি - আর যাত্রার সময়ের তুলনায় খাবারের পরিমান ও যথেষ্ট ছিল না - অতএব প্লেন যখন এয়ারপোর্ট এ নামছে, আমরা দুটি প্রাণী প্রায় অবসন্ন হয়ে পড়েছি। কিন্তু তবুও - ক্লান্তিকে জোর করে পিছনে রেখে দিলাম। ভালো করে চেয়ে দেখলাম - বাইরে ঝকঝকে রোদ আর পরিষ্কার আকাশ আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। নতুন দেশ - নতুন শহর - নতুন করে, শুন্য থেকে জীবন গড়ে তুলতে এই দেশে এসেছি - কেমন হবে এই দেশ? কেমন হবে লোকজন?মানিয়ে নিতে পারব কি? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মন কে শক্ত করে নিলাম - ভালো হোক মন্দ হোক - আপাতত এটাই আমার দেশ - এখানেই আমাকে থাকতে হবে, এখানেই আমাকে বাঁচতে হবে।

সেই মুহুর্তে মনে হলো যেন দ্বিতীয় বার শ্বশুরবাড়ি এলাম - তফাত এটাই যে সেদিন যাদের কাছে এসেছিলাম তাদের সঙ্গে বেশ খানিকটা পরিচয় ছিল - আর আজ শুধু একমাত্র H ছাড়া এই বিশাল মহাদেশে একটি চেনা মানুষের সাথেও যোগাযোগ নেই। শুধু মাত্র H এর ভরসায় এই অচেনা দেশে চলে এসেছি। কেমন আছে H? অনেক বদলে গেছে কি? হয়ত এতটাই বদলে গেছে , এতটাই দূরে চলে গেছে যে আমি তাকে চিনতেও পারব না।

(ক্রমশঃ...)

musicmaniac1
Posts: 7
Joined: Tue Mar 26, 2019 4:22 pm
Reputation: 0
Location: New Jersy
Gender:
United States of America

Re: এ পরবাসে........

Post by musicmaniac1 » Tue Mar 26, 2019 4:27 pm

প্লেন এর বাইরে এসে দেখি, ইমিগ্রেশন কাউন্টার এর সামনে বিরাট লাইন - আমার কাউন্টার এর সামনে পৌঁছতে প্রায় ১ ঘন্টা লাগবে। লাইন এ আমার সামনের ভদ্রলোক একজন পাকিস্তানি আর পিছনের ভদ্রলোক বাংলাদেশের (সকলেরই হাতে পাসপোর্ট ছিল তাই বুঝতে অসুবিধে হয় নি ). তেপান্তরের মাঠের মত বিশাল এয়ারপোর্ট এর সামনে ঢলে পরা সূর্যের আলোতে অবসন্ন কন্যার হাত ধরে দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় ওই দুই ভদ্রলোককে আমার প্রায় আত্মীয়ের মত মনে হচ্ছিল। পরেও দেখেছি, আমেরিকার মাটিতে পদার্পণ এর পর ভারতীয় উপমহাদেশের যে কোনো অপরিচিত লোককেও খুব কাছের মনে হয় - আমরা হাসিমুখে আপনার লোকের মত কথা বলি - আর তাঁরাও ওই ভাবেই আমাদের আপন করে নেন। আত্মীয়তা ব্যাপারটা হয়ত খুব রিলেটিভ - বৃত্ত যখন ছোট হয়ে যায় - তখন হয়ত মনের জানালা গুলো ও বন্ধ হয়ে আসে।

ইমিগ্রেশন কাউন্টার এ একজন মহিলা অফিসার কে দেখে ঠিক পাঞ্জাবি শিখ্নী বলে মনে হলো - আমি তার কাছেই কাগজ পত্র নিয়ে দাঁড়ালাম - কিন্তু তিনি শিখ্নী নন - তিনি মেক্সিকন বা এখানে যাদের হিস্পানিক বলা হয়। মেক্সিকান দের প্রায় অবিকল ভারতীয়দের মত দেখতে - কালো চুল বা একটু তামাটে রোদে পোড়া গায়ের রং - প্রথম প্রথম আমি মেকসিকান দের দেখে প্রায় ই ভারতীয় বলে ভুল করতাম।

প্লেন নামার প্রায় দুই ঘন্টা পরে মালপত্র নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরোলাম - বাইরে ভিড়ে এক কোনায় H দাঁড়িয়ে ছিল - দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে একটু শুকনো গলায় জিজ্ঞাসা করলাম - কেমন আছ?

ট্যাক্সি সামনেই ছিল - মালপত্র তাতে তুলতে তুলতে লক্ষ্য করলাম যে এয়ারপোর্ট এর গায়েই সাবওয়ে স্টেশন। প্রচুর লোক ট্যাক্সি না নিয়ে প্লেন থেকে নেমে ট্রেন ধরে বাড়ি চলে যাচ্ছে। H বলল দেখো এখানকার সিস্টেম - এখানকার সাধারণ লোকেদের ও প্রায় ই এয়ার ট্রাভেল করতে হয় তাই লোকেদের এয়ারপোর্ট এ আসতে যাতে বেশি পয়সা খরচ না করতে হয়, তাই এই ব্যবস্থা।

ট্যাক্সি টা air - conditioned (এখানকার সব ট্যাক্সি ই তাই) - কিন্তু আমার অগাস্ট মাসেও বেশ শীত শীত করছিল - তাই বন্ধ করে দিতে বললাম। আমরা এসেছি আমেরিকার সব থেকে বড় শহরে - কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে কিছুটা বেরিয়েই দেখি রাস্তা ঘাটে কোনো প্রায় লোকজন নেই - খালি একটার পর একটা গাড়ি হুশ হুশ করে চলে যাচ্ছে। আরও একটু গিয়ে দেখি রাস্তার দুধারে প্রায় ঘন জঙ্গল - শহর এর এত কাছে জঙ্গল দেখে আমি তো হাঁ - H বলল এখানে নাকি লোকে ক্যাম্প করে থাকতে আসে।

আরও কিছুটা এগিয়ে আমরা শহরতলি তে এসে পৌঁছলাম - তখন প্রায় অন্ধকার। রাস্তাটা একটু উঁচু হয়ে একটা এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর সামনে এসে পড়ল - আমি আমার নতুন বাসস্থানে এসে পৌঁছলাম। পাঁচতলা বাড়ি - আমাদের ফ্লাট চার তলাতে। কাঠের মেঝে - দেওয়াল গুলো হালকা কাঠের তৈরী - টোকা মারলে আওয়াজ পাওয়া যায়।

কিন্তু তখন ওসব দেখার ক্ষমতা ছিল না - ক্ষিদে তে ঘুমে শরীর জুড়ে আসছে। H বলল - আগে খেয়ে নিয়ে রেস্ট নাও - তুমি ভালোবাস বলে সর্ষে দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না করে রেখেছি।

(ক্রমশঃ...)

musicmaniac1
Posts: 7
Joined: Tue Mar 26, 2019 4:22 pm
Reputation: 0
Location: New Jersy
Gender:
United States of America

Re: এ পরবাসে........

Post by musicmaniac1 » Tue Mar 26, 2019 4:29 pm

বিদেশে এসে প্রথম দিনই ইলিশ মাছ খাবার সৌভাগ্য হবে তা স্বপ্নেও ভাবি নি। H মেয়ের জন্য পোনা মাছ ভেজে রেখেছিল। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম - কোথায় পেলে এই মাছ? H বলল, এখানে জ্যাকসন হাইটস বলে একটা জায়গা আছে - সেখানে সব ভারতীয় আর বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। সেখান থেকে নিয়ে এসেছি। ওখানে গেলে তোমার মনে হবে না বিদেশে আছ।

আমার প্রায় চোখে জল চলে এলো - এই বাড়িটা যেখানে, সেখান থেকে জ্যাকসন হাইটস অনেক দূর - H এর অফিস ও অনেক দূর। H সারাদিন অফিস করে তারপরে বাজার করে বাড়ি এসে রান্না করে রেখেছে আমাদের জন্য। H এর কোনো গাড়ি ও ছিল না তখন - সব জায়গায় হেঁটে হেঁটে গিয়ে এক গাদা বাজার করে এনেছে। খাবার ছাড়াও সংসারের যা যা জিনিস, অন্তত যেগুলো ওর মনে পড়েছে - সব একা গিয়ে কিনে বয়ে বয়ে নিয়ে এসেছে (আসলে আমরা আসার আগে H ওর বন্ধুর সাথে থাকত। আমরা আসার আগে একটা নতুন এপার্টমেন্ট এ চলে আসে। এই নতুন এপার্টমেন্ট এ সব কিছুই H কে নিজে কিনে নিতে হয়েছে। আমরা যখন আসি, তখন ও এপার্টমেন্ট এ একটা ছোট টেবিল আর দুটো চেয়ার আর দুই ঘরে দুটো খাট ছাড়া কিছুই ছিল না - পরে আস্তে আস্তে সব কেনা হয়েছিল).

বাইরেটা চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল - জানালার বাইরে খুব সুন্দর সাজানো বাগান - তার পরে একটা রাস্তা - রাস্তা পার করেই সমুদ্র। চারিদিক নিস্তব্ধ - কেমন যেন অপার্থিব লাগছিল জানালার বাইরের জগতটাকে।

(ক্রমশঃ...)

musicmaniac1
Posts: 7
Joined: Tue Mar 26, 2019 4:22 pm
Reputation: 0
Location: New Jersy
Gender:
United States of America

Re: এ পরবাসে........

Post by musicmaniac1 » Tue Mar 26, 2019 4:30 pm

নতুন সকাল :

পরের দিন সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে গেল - উঠে জিনিসপত্র গোছাতে বসলাম। এপার্টমেন্ট এর মেঝে কাঠের - শুধু রান্না ঘরে tiles থাকে। রান্নাঘরে গ্যাস ওভেন, বেকিং ওভেন, মাইক্রোওয়েভ, ডিশ ওয়াশার আর রেফ্রিজারেটর বসানোই ছিল - এখানে খুব কম খরচের এপার্টমেন্ট এও গ্যাস ওভেন, বেকিং ওভেন আর রেফ্রিজারেটর থাকে - তবে অনেক এপার্টমেন্ট এই মাইক্রোওয়েভ বা ডিশ ওয়াশার থাকে না। আরও একটা অদ্ভুত জিনিস যে এখানে এপার্টমেন্ট এ বা কোনো বাড়িতেই tubelight বা ceiling fan এর কোনো ব্যবস্থা নেই. এখানে গরম লাগলে কোনো standing fan লাগিয়ে নেয় আর light এর জন্য ও কোনো table lamp বা standing lamp এর ব্যবস্থা করে নিতে হয়। এছাড়া প্রত্যেক বাড়ি বা এপার্টমেন্ট এ heating এর ব্যবস্থা থাকে - যদিও সব এপার্টমেন্ট এ air conditioning এর ব্যবস্থা থাকে না - অনেক সময় নিজেদেরই কিনে নিতে হয়।

একটু ব্রেকফাস্ট করে বাজার করতে বেরোলাম - কাছাকাছি একটা সুপারমার্কেট ছিল - সেটাতে পুরো খাবার আর দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো জিনিস সবই পাওয়া যায়। এ ছাড়াও কিছু ছোট ছোট দোকান থাকে - যেগুলো কে অনেকটা আমাদের মুদিখানার সমান ধরা যেতে পারে। তবে আমাদের দেশের মত প্রতিটি কোনায় কোনায় দোকান নেই - কোনো একটা রাস্তা বা শহরের একটা এলাকার মধ্যেই সব দোকান থাকে (downtown area). কেনা কাটা সেরে বাড়িতে ফিরতেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলো - তখন ভারতীয় সময়ে রাত - আমার শরীর এর ঘড়ি টা তখন ও আমেরিকার সময়ে অভ্যস্ত হয় নি - তাই দিনের বেলাতেই প্রায় মড়ার মত ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাত ঘুমের মধ্যে মনে হলো - কে যেন ডাকছে - ‘ওঠ ওঠ - এই বিকাল বেলা পড়ে পড়ে ঘুমচ্ছিস?’ চোখ মেলে যাকে দেখলাম, তাকে দেখে মন তা খুশিতে ভরে গেল।

(ক্রমশঃ...)

Post Reply